দেখিতে গিয়াছি চক্ষু মেলিয়া









বইয়ের নাম - দেখিতে গিয়াছি চক্ষু মেলিয়া

সম্পাদক - কৌশিক জামান
প্রকাশনী - অবসর
মুদ্রিত মূল্য - ৩৫০/=
The bucket list, Into the Wild, Under the Tuscan sun, Out of Africa, Midnight in Paris এসব সিনেমা যতবার দেখেছি ততবার সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে ভবঘুরে হয়ে দেশের পর দেশ ঘোরার পোকা মাথায় আরো পোক্ত বাসা বেধেছে। ভ্রমণ কাহিনি পড়লে ভ্রমণের স্বাদ পাওয়া যায় ব্যাপারটা এমন না, আ বরং আরো তৃষ্ণা বাড়ায়।
"দেখিতে গিয়াছি চক্ষু মেলিয়া " -উজ্জ্বল রঙের মিশেলে প্রচ্ছদশিল্পী সম্পূর্ণ বইটিকেই মলাটে তুলে ধরেছেন।
বইটি সাতটি ভ্রমণ কাহিনির সংকলন। দার্জিলিং, মেক্সিকো, আন্দামান, কেনিয়া, পন্ডিচেরী, স্পেন এবং বালি - সাতজন মানুষ জীবনের সুন্দরতম দিনগুলো থেকে কিছু অংশ তুলে দিয়েছেন প্রতিটি পাতায় পাতায়।
📌গরম লাগে তো দার্জিলিং গেলেই পারো (নাবিল মুহতাসিম)—
ভারতে নেই এমন কিছু বোধহয় কমই আছে বিশ্বে। এখানে যেমন বরফাচ্ছাদিত প্রান্তর আছে তেমনি আছে ধু ধু মরুভূমি। দার্জিলিং যে কি মারাত্মক সুন্দর জায়গা সেটা লেখকের কাহিনিতে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। সেইসাথে আছেন মাঝে মাঝে আমার সত্যজিৎ! ব্যাস, আর কি লাগে। প্রান্তীয় স্থান হিসেবেও বাংলাদেশ থেকে অনেকাংশে যে উন্নত সেইসব জায়গার মানুষ তারও বেশ কিছু উদাহরণ পাওয়া যায়। পরিশেষে বলা যায় এই ভ্রমণ কাহিনি পড়ার সময় আমি ঘুমে ছিলাম।
📌জমকালো জন্মদিন ( ফারিয়া প্রেমা) —
মেক্সিকোকে নিয়ে লিখেছেন ফারিয়া প্রেমা। উনার জন্মদিনটা কতোখানি সুন্দর করে কেটেছে বিদেশে - তারই গল্প করেছেন গল্পটা জুড়ে ৷ সম্পূর্ণ অপরিচিত কিছু মানুষের এই আন্তরিকতার কথা নিঃসন্দেহে বর্তমান সময়ে আমাদেরকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে । সেই সাথে লেখিকার প্রথম পিরামিড দর্শনের অনুভূতি পড়ে এক অন্যরকম উত্তেজনা কাজ করবে পাঠকদের মনে ৷
📌এমারেন্ড এবং ব্লু (রাজিব আহসান)— আন্দামান সম্পর্কে মানুষের মতামত, বিভ্রান্তি , যাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধা, সেইসব নিয়েই লেখার শুরু ৷ আন্দামানের ইতিহাসের কিছু ঘটনা ছোট করে লেখা আছে যেগুলো খুব সুখকর নয়। আন্দামানের মূল আকর্ষণ হলো এর দ্বীপগুলো । প্রত্যেকটি জায়গার লেখক খুব সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন ৷ একটা কথা জেনে খুব ভালো লেগেছে যে পর্যটন উন্নতির পাশাপাশি প্রশাসন সেখানকার জলজ জীবন এবং ইকোসিস্টেম রক্ষার্থেও কাজ করে।
📌 বিগ ফাইভের খোঁজে (আদিবা তাসমীম)
আফ্রিকার বিগ ফাইভ বলতে মূলত সিংহ, গন্ডার, চিতা, হাতি এবং মহিষকে বোঝায় । সারা গল্প জুড়েও ছিল নানান রকম পার্ক আর ক্যাম্পে দেখা নানান রকম জীবজন্ত নিয়ে মজার সব তথ্য আর বর্ণনা। বিগ ফাইভ ছাড়াও অস্ট্রিচ, ব্যাবুন, শূকর, মিরক্যাটের বর্ণনাও আছে । তার গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অংশটুকু ছিল তার সিংহ দর্শনের জায়গাটা । যদিও আমি বহুবার সিংহ দেখেছি তবে লেখিকার বর্ণনা পড়ে মনে হচ্ছিলো মনে মনে আবার সিংহ দর্শন করি কারণ এভাবে তো ভাবিও নাই আগে। এছাড়া প্রকৃতি এবং তার সৌন্দর্য নিয়েও সুন্দর লিখেছেন ।
📌 এক টুকরো প্যারিসের সন্ধানে পন্ডিচেরিতে (মুহাম্মদ আহসান নাহিয়ান) —
সম্পূর্ণ কাহিনির মাঝে মাঝে কিছু অণুকাব্য আছে লেখকের নিজের লেখা, এই ব্যাপারখানা বেশ ইউনিক লেগেছে।নতুন কিছু খাবারের বর্ণনা, পরিবেশনের খুটিনাটি এবং তা নিয়ে বিস্তারিত অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতির কথা তিনি লিখেছেন বেশ গুছিয়ে। সবচে সুন্দর করে লিখেছেন পন্ডিচেরীর কথা ৷ ফ্রান্সের প্রতি আমার অবসেশনের কথা যারা যানেন না তাদের বলি ফ্রেঞ্চ ভাইবের পন্ডিচেরী বলেই এই গল্প আমি গোটা পাঁচেকবার পড়ে ফেলেছি এরই মধ্যে এবং অবশ্যই লেখকের আরামদায়ক ভাষা আমাকে সাহস জুগিয়েছে । আবার, জেকে নলেজ হিসেবে পন্ডিচেরী শব্দটির উৎপত্তি এবং স্থানটির ঐতিহাসিক কিছু বর্ণনাও আছে ।
📌 মায়োর্কো, টেস্ট অফ স্পেন (সাবাবা মঞ্জুর) — লেখিকার বাক্যগঠন এবং ভাষা শৈলী দেখে মনে হয় তিনি বেশ ছটফটানো স্বভাবের এবং এর পুরোটাই তিনি তার লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন সফলভাবে । বিশেষত প্রকৃতি নিয়ে তার বর্ণনাগুলো খুব বেশীই ভালো লেগেছে ৷ শেষাংশে খানিকটা তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা আছে এবং তা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা বলে মনে করি আমি।
📌 ঈশ্বর দ্বীপে এক সপ্তাহ (কৌশিক জামান)—
বালি খুবই সুন্দর একটা পর্যটনকেন্দ্র , সেই সাথে সেইখানের খাবার, পরিবেশ, সমুদ্র, ম্যাসাজ পার্লার নিয়ে বর্ণনাগুলো পড়ে ভালোর পাশাপাশি মজাও লেগেছে । বাচ্চাদের সাথে লেখকের দুষ্টুমির কথা, সহজ সাবলীল ভাষায় সুন্দর এবং মনোরম জায়গাগুলোর বর্ণনাগুলো পড়েই বোঝা যাচ্ছিলো লেখকের সেন্স অব হিউমার বেশ ভালো। নিজের কিছু ব্যক্তিগত অনুভূতির কথাও বলেছেন তিনি এবং সব মিলিয়ে এই অংশটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে।
আমার ভ্রমণ কাহিনি পড়ার সূচনা হয়েছিল জুল ভার্নের হাত ধরে। এই বইটি পড়েও খুব ভালো লেগছে। বেশ অন্যরকম একটি উদ্যোগ।
ব্যক্তিগত রেটিং - 🌟🌟🌟🌟🌟

Comments

Popular posts from this blog

সারেং বৌ

ইন্দুবালা ভাতের হোটেল

যেখানে রোদেরা ঘুমায়